আমেরিকার প্রেসিডেন্টদের সাথে বাংলাদেশের যেসব সরকারপ্রধান বৈঠক করেছেন
আমেরিকার প্রেসিডেন্টদের সাথে বাংলাদেশের যেসব সরকারপ্রধান বৈঠক করেছেন
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস নিউ ইয়র্ক সময় মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সাইডলাইনে এই দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস নিউ ইয়র্ক সময় মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সাইডলাইনে এই দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, যখন দুজন সরকারপ্রধান আনুষ্ঠানিক ভাবে বৈঠক করেন সেটিকে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হিসেবে বর্ণনা করা হয়। সে হিসেবে গত 23 বছরে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সরকার প্রধানদের মধ্যে কোনও দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়নি বলে জানান মি কবির।সর্বশেষ 2023 সালের সেপ্টেম্বর মাসে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত জি 20 সম্মেলনে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের দেখা হয়েছিল। তখন প্রেসিডেন্ট বাইডেনের সাথে শেখ হাসিনা ও তার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদের একটি সেলফি নিয়ে বিস্তর আলোচনাও হয়েছিল। সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবীর বলছেন, দিল্লিতে শেখ হাসিনার সাথে জো বাইডেনের পুল সাইড মিট হয়েছিল যে তাকে শুভেচ্ছা বিনিময় বলা যেতে পারে।দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হতে হলে সেটির একটি স্ট্রাকচার থাকে। দুই সরকার প্রধান ছাড়াও উভয় দেশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকেন। সেখানে কিছু আলোচ্য বিষয় নির্ধারণ করা হয় বলেন হুমায়ুন কবির। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের বেশ কয়েকজন সরকারপ্রধান যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সাথে বৈঠক করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের অফিস অব দ্য হিস্টোরিয়ান রেকর্ডে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশের ছয় জন সরকারপ্রধান আমেরিকায় গিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্টের সাথে বৈঠক করেছেন।এই ছয়জনের মধ্যে সাবেক সামরিক শাসক জেনারেল এরশাদ দুইবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সাথে বৈঠক করেছেন। এর বাইরে 2000 সালে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন।1974 সালের পয়লা অক্টোবর বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে বৈঠক করেন। যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ডের সাথে।সেই বৈঠকে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলে আরও ছিলেন তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড। কামাল হোসেন এবং ওয়াশিংটনে বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রদূত হুসেন আলি।প্রেসিডেন্ট ফোর্ড এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের বৈঠকটি ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত। সেই বৈঠকের অফিসিয়াল কথোপকথনের বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়েছে। জেরাল্ড ফোর্ড প্রেসিডেন্সিয়াল লাইব্রেরিতে।বৈঠকে শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, 19 পঁয়তাল্লিশ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে জার্মানির যে অবস্থা হয়েছিল, বাংলাদেশের অবস্থাও ঠিক একইরকম। তিনি বলেন, যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের অনেক কিছুই ধ্বংস হয়ে গেছে। তারপর খরা ও বন্যার আঘাতে এসেছে।শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্যের কারণে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ড কে শেখ মুজিবুর রহমান আরও বলেন, আমরা দুর্ভিক্ষের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি। শুনেছি যে একটি সাইক্লোন আঘাত হানতে যাচ্ছে। আমরা খুব খারাপ অবস্থার মধ্যে আছি। মানুষজনকে খাওয়ানোর জন্য বিভিন্ন জায়গায় আমি লঙ্গরখানা খুলেছে।জবাবে জেরাল্ড ফোর্ড বলেন, বাংলাদেশকে সহায়তা করার জন্য ধোনি তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর সমন্বয়ে বাংলাদেশ কনসোর্টিয়াম করলে ভাল হবে কি না।শেখ মুজিবুর রহমান তখন জেরাল্ড ফোর্ড কে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান। জবাবে জেরাল্ড ফোর্ড বলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশে যাচ্ছেন না। শেখ মুজিব বলেন, তিনি যাচ্ছেন। কিন্তু আমি আপনাকে আমন্ত্রণ জানাতে চাই।1980 সালে জাতিসংঘ অধিবেশন শেষ করে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের অফিসিয়াল বাসভবন হোয়াইট হাউসে যান।তখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ছিলেন জিমি কার্টার। সে সময় আমেরিকা নির্বাচন ঘনিয়ে আসছিল। অনেক ব্যস্ততার মধ্যেও মিস্টার কার্টার প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সাথে বৈঠক করেন। হোয়াইট হাউসে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটির অন্তর্গত আমেরিকান প্রেসিডেন্সি প্রজেক্ট দেশটির প্রেসিডেন্টের শাসন আমলের বিভিন্ন দলিল পত্র সংগ্রহ করে এবং সেগুলো তাদের ওয়েবসাইটে অবমুক্ত করে। সেখানকার একটি দলিলে জিয়াউর রহমানের হোয়াইট হাউস সফর এবং তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের সাথে যৌথ সংবাদ সম্মেলনের পুরো অংশ তুলে ধরা হয়েছে।প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং জিমি কার্টারের মধ্যে আলোচ্য বিষয় ছিল বাংলাদেশে আমেরিকার সাহায্য নিয়ে। এর আগের বছর যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে 84 মিলিয়ন ডলার সাহায্য দিয়েছিলো। সে বছর বাংলাদেশ 1.5 বিলিয়ন ডলার সহায়তার প্রতিশ্রুতি পেয়েছিল। জিয়াউর রহমানের সাথে বৈঠকে প্রেসিডেন্ট কার্টার বাংলাদেশের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রশংসা করেন।আফগানিস্তান এবং কম্পুচিয়া থেকে বিদেশি সৈন্য প্রত্যাহারের ব্যাপারে গুরুত্ব দেন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার ও জিয়াউর রহমান।সে সময় বাংলাদেশ জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে অস্থায়ী সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিল ওভাল অফিসে। বৈঠক শেষে প্রেসিডেন্ট কার্টার ও প্রেসিডেন্ট জিয়া সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেন।সেখানে মিস্টার কার্টার বলেন, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ বৈশ্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এর আগে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রেসিডেন্ট জিয়া তেল উৎপাদনকারী দেশগুলির সংগঠন ওপেক কে আহ্বান জানান, যাতে তারা উন্নয়নশীল দেশগুলোর কাছে কম মূল্যে তেল বিক্রি করে।1983 সালের অক্টোবর মাসে বাংলাদেশের তৎকালীন সামরিক শাসক জেনারেল এরশাদ হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে দেখা করেন। যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগানের সাথে সেই বৈঠকের পর রোনাল্ড রেগান ও হুসেইন মহম্মদ এরশাদ একটি যৌথ সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানে মিস্টার খান বলেন, গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ফিরিয়ে আনার জন্য কাজ করছেন জেনারেল এরশাদ। তিনি বলেন, জেনারেল এরশাদ তার দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য যেভাবে কাজ করছেন।সেটি প্রশংসার দাবি রাখে। জেনারেল এরশাদ ব্যক্তি খাতের বিকাশে কাজ করছেন। সংবাদ সম্মেলনে মিস্টার এরশাদ বলেন, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি ও গ্রামে কর্মসংস্থান বাড়ানোর জন্য তাঁর সরকার উদ্যোগ নিয়েছে।1990 সালের অক্টোবর মাসের শুরুতে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জেনারেল এইচ এম এরশাদ বৈঠক করেন। যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের সাথে জর্জ ডব্লু বুশ প্রেসিডেন্সিয়াল লাইব্রেরিতে এইচ এম এরশাদের সাথে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশের বৈঠকের বিস্তারিত ডকুমেন্ট অবমুক্ত করা হয়েছে। সব কাগজপত্র থেকে জানা যায়, এরশাদ বুশ বৈঠকে প্রায় পুরোটা জুড়েই তৎকালীন ইরাক ও কুয়েত পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সেখানে ইরাকের তত্কালীন প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে নিয়েও আলোচনা হয়।নিউ ইয়র্কের একটি হোটেলে 40 মিনিটের সেই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। জেনারেল এরশাদের সাথে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলে ছিলেন তৎকালীন পররাষ্ট্র মন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ। জাতিসংঘে বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রদূত আতাউল করিম।সেই সময় তৎকালীন ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হুসেনের নির্দেশে কুয়েট দখল করে নিয়েছিল ইরাকি বাহিনী। প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের সাথে পুরবৈঠকে ইরাক পরিস্থিতি নিয়ে আলাপ হয়েছে জেনারেল এরশাদের সে বৈঠকের গোপন অফিসিয়াল নথি অবমুক্ত করা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট বুশ জেনারেল এরশাদকে জিজ্ঞেস করেন, আপনার কি মনে হয় সাদ্দাম হোসেন তার আগ্রাসী ভূমিকা নিয়ে বিশ্বের প্রতিক্রিয়া হতে পারে সেটি বুঝতে পারেননি। জবাবে জেনারেল এরশাদ বলেন, তিনি ভাবতে পারেননি যে পুরো বিশ্ব তাঁর বিপক্ষে চলে যাবে।বৈঠকে জেনারেল এরশাদ প্রেসিডেন্ট বুশকে বলেন, বাদশাহ ফাহাদ আমাকে বলেছেন যে সাদ্দাম হোসেনের নিরানব্বইটি নাম আছে সে আসলে পাগল হয়ে গেছে।1992 সালের মার্চ মাসে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সাক্ষাৎ করেন। যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের সাথে হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে প্রায় 1 ঘণ্টা যাবৎ সে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। হোয়াইট হাউসের তৎকালীন প্রেস সেক্রেটারি সেই বৈঠক সম্পর্কে একটি বিবৃতি দিয়েছিলেন। সেই বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এবং তার জর্জ ডব্লিউ বুশ কথা বলেন, বাংলাদেশের গণতন্ত্র অর্থনৈতিক অগ্রগতি, ইরাক যুদ্ধ এবং রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়ে।কুয়েতে ইরাকি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশে ভূমিকা রেখেছে। সেটার প্রশংসা করেন মিস্টার বোস।সে সময় মিয়ানমার থেকে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছিল। প্রেসিডেন্ট বুশ এবং প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এই ঘটনার নিন্দা জানান।2000 সালে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের 212 বৈঠক হয়েছে। 2000 সালের মার্চ মাসে ঢাকা সফরে আসেন বিল ক্লিনটন মিস ক্লিনটন ছিলেন একমাত্র মার্কিন প্রেসিডেন্ট যিনি ক্ষমতায় থাকার সময় বাংলাদেশ সফর করেছিলেন। এর আগে কিংবা পরে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশ সফর করেননি।এর সাত মাস পরে শেখ হাসিনা হোয়াইট হাউসে গিয়ে ক্লিনটনের সাথে বৈঠক করেন।ক্লিনটন ঢাকা সফরের সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পাশাপাশি তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়ার সাথেও বৈঠক করেন। 2000 সালের অক্টোবর মাসে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে বৈঠক করেন। যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের সাথে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি এক বিবৃতিতে জানান, প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওয়াশিংটন সফর করেন।দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক জোরদার করার জন্য এসব সফর অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি জানিয়েছিলেন।
