চীন আসলে কতটা 'কমিউনিস্ট'?
চীন আসলে কতটা 'কমিউনিস্ট'?
বিড়ালটি কালো না সাদা সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়৷ যদি ইঁদুর ধরতে পারে।এই কথাটা কি পরিচিত শোনাচ্ছে?
বর্তমানে চিন কতটা সমাজতান্ত্রিক সে তার সাথে এ কথা কি সম্পর্ক আছে?
আসলে অনেক সম্পর্ক আছে। একথা জনপ্রিয় হয়েছিল। 1970 এর দশকে চীনের নেতা জিনপিং এর মাধ্যমে যিনি চীনের অর্থনীতি রূপান্তরে সূচনা করেছিলেন এবং যার মাধ্যমে চীন এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হয়েছে।মা কিন্তু এর মাধ্যমে তিনি কী বোঝাতে চেয়েছিলেন। মূলত যখন অর্থনীতি কাজ করে তখন তা ভাল অর্থনীতি।কমিউনিজম অথবা সমাজতন্ত্র এ সব সঙ্গে নিয়ে তিনি মোটেও চিন্তা করতেন না। তাঁর আগ্রহ ছিল একটি শক্তিশালী অর্থনীতির দিকে।তাই 1978 সালে চীনের বিখ্যাত কমিউনিস্ট নেতা মাও সেতুং এর মৃত্যুর পর ডেং শিয়াওপিং একটি নতুন অর্থনৈতিক কর্মসূচি প্রবর্তন করেন। এটি সংস্কার এবং উন্মুক্ত করার নামে পরিচিত হয়, যা বিশেষজ্ঞদের মতে বিশ্বের ইতিহাসের যে কোনও অর্থনীতির সবচেয়ে বিস্ময়কর অর্থনৈতিক উন্নয়নের নজির বলে বর্ণনা করা হয়েছে।তবে চলুন কয়েক বছর পেছনে যাওয়া যাক এবং দেখা যাক এই পরিবর্তন কতটা বৈপ্লবিক ছিল।75 বছর আগে কমিউনিস্ট পার্টি চীনের ক্ষমতায় আসে এবং এই দলের নেতা মাও সেতুং নতুন গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের জন্য ঘোষণা করেন।মা 1958 সালে তার বিখ্যাত অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ঘোষণা করেন, যেটা ইংরেজিতে দ্যা গ্রেট লিপ ফরওয়ার্ড বা এগিয়ে যাওয়ার জন্য বড় ধরনের লাফ দেয়, তাঁকে বোঝানো হয়েছে।এর একটি প্রধান স্লোগান ছিল গ্রেট ব্রিটেনকে অতিক্রম করা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষ হওয়া।এর মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন স্টিল উৎপাদন করা তখন শিল্পোন্নত দেশগুলোর অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি ছিল এটি।মাও চেয়েছিলেন চীনকে অতি শিল্পোন্নত দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে সেটি করতে গিয়ে তিনি ব্রিটেন ও আমেরিকার বিপরীতে হাঁটলেন।এরফলে তিনি দেশের ব্যক্তি খাত বিলুপ্ত করে ব্যবসা, কারখানা ভূমি জাতীয়করণ করলেন। কমিউনিস্ট আদর্শ অনুযায়ী মা ও ব্যক্তিগত মালিকানার পরিবর্তে সম্পদের যৌথ মালিকানা সমবায় খামার এবং কাজ করার জন্য ছোট ছোট গ্রুপ তৈরি করলেন।কিন্তু তার অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ভয়াবহ ভাবে ব্যর্থ হয়েছিল। যার ফলে চীনে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ তৈরি হয় এবং তাতে প্রায় 3,00,00,000 মানুষ অনাহারে মারা যান।মাও চিনে তথাকথিত সাংস্কৃতিক বিপ্লব শুরু করেন।নিজের ক্ষমতাকে শক্তিশালী করার জন্য মা 1966 থেকে 1900 76 সাল পর্যন্ত পুঁজিবাদ এবং যাঁরা পুরনো ব্যবস্থায় বিশ্বাস করতেন তাদের নির্মূল করেন।কিন্তু এই প্রচেষ্টা রাজনৈতিক সহিংসতার মধ্যে শেষ হয় এবং প্রায় 20,00,000 মানুষের মৃত্যু হয়।মা যখন মারা যান তিনি চীনকে একটি দরিদ্র দেশ হিসেবে রেখে যান। তখন দেং জিয়াওপিং যিনি বিড়ালের বিখ্যাত উক্তিটি করেছিলেন, তিনি একটি বড় ধরনের পরিবর্তন প্রস্তাব করেন। সেটি হচ্ছে বাজারভিত্তিক অর্থনীতি। শুরুতে ব্যাংক অর্থনীতিকে উন্মুক্ত করে দেন। তিনি ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ করেন। কাজের জন্য গঠিত দলগুলোকে ভেঙে দেন এবং কৃষকদের তাদের জমি পরিচালনা এবং উৎপাদিত পণ্য বিক্রির জন্য আরও স্বাধীনতা দেন। ব্যাঙ্ক ক্ষমতায় আসার পর প্রাইভেট সেক্টর বা ব্যক্তিগত কাজ ফিরে আসেন। তিনি চীনকে বিশ্বের কাছে উন্মুক্ত করেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে।সম্পর্ক শক্তিশালী করে এবং এভাবে একে একে কোকাকোলা, বোয়িং এবং ম্যাক ডোনাল্ডস এর মতো পুঁজিবাদী বহুজাতিক সংস্থাগুলি চিনি আসে। ব্যাঙ্কের এই ফর্মুলা চীনা বৈশিষ্ট্যের সমাজতন্ত্রের হিসাবে পরিচয় পেয়েছিল এবং ব্যাং এর পর থেকে চীনের নেতারা এই নীতি কমবেশি অনুসরণ করে আসছেন।এটি চীনকে চার দশক ধরে ধারাবাহিকভাবে এবং রেকর্ড গতিতে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি পেতে সহায়তা করেছে। বিশ্ব ব্যাঙ্কের তথ্য অনুযায়ী, এর ফলে চিনের ছিয়াত্তর কোটিরও বেশি মানুষ দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন এবং লক্ষ্য করলে দেখা যায় আমাদের চারপাশে অনেক পণ্যই মেড ইন চায়না, শাওমি ওপো এবং বিবাহ হল বিশ্বের বৃহত্তম ফোন কোম্পানিগুলোর মধ্যে কয়েকটি ফাইভ জি প্রযুক্তির বিকাশে হুয়াওয়ে একটি শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি।লেনোভো আরেকটি বেসরকারি চিনা কোম্পানি যা বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সংখ্যক কম্পিউটার বিক্রি করে থাকে। বিশেষজ্ঞরা তাই বলছেন যে অর্থনৈতিক ভাবে বর্তমান চিন সাম্যবাদের চেয়ে পুঁজিবাদের কাছাকাছি অবস্থান করছে। কিন্তু এখানে কিছু অস্পষ্টতা রয়েছে।চিনা সরকার এখনও প্রাইভেট সেক্টর বা ব্যক্তিগত খাতে বড় ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। চিনা বেসরকারি কোম্পানিগুলিকে অবশ্যই রাষ্ট্রীয় পরিদর্শনের মধ্যে দিয়ে যেতে হয় এবং এর মধ্যে কমিউনিস্ট পার্টির কমিটি থাকতে পারে, যা সিদ্ধান্ত গ্রহণকে প্রভাবিত করতে পারে।যদিও দারিদ্র্য হ্রাস পেয়েছে, তবে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে ব্যবধান বেড়েছে। প্রথম নয় বছর পর শিক্ষা বিনামূল্যে দেওয়া হয় না।বেশিরভাগ চীনা নাগরিক এখনও বিনামূল্যে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা পাচ্ছেন।তবে উচ্চবিত্তরা ব্যক্তিগত সবাই ব্যবহার করেন।একই সময়ে চিন একটি বড় আবাসন সংকটের মুখোমুখি হয়েছে, যেখানে লক্ষাধিক নতুন নির্মিত ঘর অবিক্রিত রয়েছে এবং অনেকেরই সেগুলো কেনার সামর্থ্য নেই।সমাজে শ্রেণী বিভেদ দূর করার জন্য কমিউনিজম যা চেয়েছিল সেটা হয়নি।তাহলে চীনকে এখনও কোনও কমিউনিস্ট বলা হয়?
এর প্রথম কারণ সাত দশক ধরে চিনকে যে দলটি নিয়ন্ত্রণ করে আসছে তাঁর নাম৷ চিনা কমিউনিস্ট পার্টি মাও সে তুং এর সময় থেকেই মানে 1900 উনপঞ্চাশ সালে যখন এটি জাতীয়তাবাদীদের পরাজিত করে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠা করে এই পার্টি একচেটিয়া ভাবে ক্ষমতার আধিপত্য বজায় রেখেছে। চিনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয় ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের মাধ্যমে। এটি হচ্ছে চিনের সংসদ। এই পিপলস কংগ্রেস কমিউনিস্ট পার্টির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং এর সাধারণ সম্পাদক হলেন দেশটির সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যক্তি।বর্তমানে এই দুটি পদে অধিষ্ঠিত আছেন শি জিনপিং এবং চিনের সংবাদমাধ্যমের খুব কম স্বাধীনতা রয়েছে এবং ইন্টারনেট ও কঠোরভাবে সেন্সর করা হয়। সরকার স্কুলের পাঠ্যক্রম এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে।2000 12 সাল থেকে শি জিনপিং এর শাসনামলে।চিন আরও কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র হয়ে উঠেছে।ভিন্নমতাবলম্বী সমালোচক এমনকি প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের উপর কঠোর দমন চালানো হয়েছে।তাঁর প্রভাবের একটি স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যায় যখন 2018 সালে তার চিন্তাধারা বা দর্শনকে দেশটির সংসদ দেশটির সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষে ভোট দেয়।তাঁরা এটিকে বলছেন নতুন যুগের জন্য চীনা বৈশিষ্ট্যের সাথে সমাজতন্ত্র বিষয়ে শি জিনপিংয়ের চিন্তাধারা।এর আগে শুধুমাত্র প্রতিষ্ঠাতা মাও সে তুং এবং ডেং শিয়াওপিং চিনের সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।এখন যখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি দীর্ঘস্থায়ী আবাসন সঙ্কটে ভুগছে। স্থানীয় সরকারের ঋণের ভার এবং উচ্চ যুব বেকারত্ব মুখোমুখি হলেও এর সাফল্য রূপান্তর এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান প্রভাব অস্বীকার করার কোনও প্রশ্নই আসে না। চিন কমিউনিস্ট পার্টির ক্ষমতায় থাকার 75 বছর উদযাপন করছে। এটি এমন একটি যোগ যা এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র বাদে অন্যান্য সমস্ত দেশের অর্থনীতিকে পিছনে ফেলেছে। একই সাথে এর রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায়।স্বৈরতান্ত্রিক সাম্যবাদী ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছে।দিনশেষে এর রং যাই হোক না কেন দাম শপিংয়ের বিড়াল এখনও ইঁদুর ভালই হয়েছে।হুঁ।
